বর্ষণমুখর একটি দিন রচনা | বর্ষণমুখর বাংলা রচনা

বর্ষণমুখর বাংলা রচনা

ভূমিকা: আষাঢ় ও শ্রাবণ দু মাস বর্ষাকাল। এ সময় খুব ঘটা করে জলসিক্ত কালাে মেঘ আমাদের দ্বারপ্রান্তে এসে হাজির হয়। নীল আকাশ কালাে। মেঘে ছেয়ে যায়। সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টির পর বিকেলের এক ঝলক রােদের পরে আবারও জমাট বাঁধতে শুরু করে মেঘ। বিষন্ন সন্ধ্যায় মেঘাবৃত আকাশ। মেঘের গুরু গর্জনে ও আকাশের বিদ্যুৎ-ঝলকানির মধ্যে লজ্জায় লাল হয় অস্তায়মান সূর্যটা বষর্ণমুখর সন্ধ্যার এ এক দুর্লভ রূপ। 
সন্ধ্যার পূর্বাভাস ও আগমন: প্রকৃতি আবছা অন্ধকারে ক্রমে অস্পষ্ট ও অদৃশ্য হতে শুরু করায় বুঝতে পারলাম সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। প্রকৃতির সন্ধ্যা যেন আজ আগেই হাজির হয়েছে। মানুষের কর্মব্যস্ততা নেই। থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ায় সকলেই ঘরের ভেতর আবদ্ধ। প্রকৃতি যেন অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ বেশি নিস্তব্দ, নিথর। শ্রাবণের বর্ষণমুখর দিবাবসানে এক সময় আঁধার ঘনীভূত হয়ে আসে। রিমঝিম শব্দে অঝাের ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। আজকের বর্ষণমুখর সন্ধ্যাকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মনে হচ্ছে। অবিশ্রান্ত বর্ষণের সুরলহরিতে মনটা তন্ময় হয়ে যায়। এমন মােহময় সন্ধ্যা আমি কখনও দেখিনি। এমন দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতাে তাই বলতে ইচ্ছে করে
‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘন ঘাের বরিষায়। 
প্রকতির বিষণতা: দুর্যোগপূর্ণ শ্রাবণ সন্ধ্যা; গ্রামান্তের পথ নির্জন; প্রকৃতির কোলজুড়ে বিষন্নতা। সর্বত্র যেন প্রিয়জন হারানাের আর্তনাদ। বেদনায়। অন্তর্লীন বাদল বাতাসের দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে যেন তার চোখের জল ঝরে পড়ছে। প্রকৃতির এমন বেদনাবিধূর ক্ষণে কিছুতেই ঘর থেকে বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না। তাই প্রকৃতির এ. বিষন্নবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “ওগাে আজ তােরা যাসূনে ঘরের বাহিরে।
আ র জামা ভাষাহীন অন্ধকারে বৃষ্টিপাতের অবিরাম শব্দ যেন বােবা প্রকৃতির বহুদিনের সংগীতমুখর অব্যক্ত ভাষা। হঠাৎ যেন নিৰ্ব্বরের স্বপ্ন ভঙ্গের পর অবিরাম নুপুরের ছন্দ তুলে বয়ে চলা। জানালার পাশে বসে বৃষ্টি পতনের এ ধ্বনি কার না হদয়ে সংগীতের না হৃদয়ে কাব্যের অনুভূতি দোলা দেয়। কবি সৈয়দ সারােয়ার-এর কবিতায় এ মুহূর্তটির অনুভব ফুটে উঠেছে এভাবে
‘খােলা জানালায় মন পালায় 
অন্ধকারে ফেরার হয়ে 
বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় 
কোথাও যদি চুপটি করে আকাশ 
ফেলে রাখে বর্ষার ফুল । 
অন্ধকারেও চিনতে এবং
শুকতে হবে না ভুল। 
বিষণ প্রকৃতির বুকে এ রকম কাব্য-সংগীতের সুরলহরি সত্যিই রােমাঞ্চকর । 
মেঘদূতের ভাষা: শ্রাবণ-সন্ধ্যার ভাষা যেন মেঘদূতেরই ভাষা। কালিদাসের মেঘদূত' কাব্যের নায়কের মতাে শ্রাবণ-সন্ধ্যা আমাকে জনশূন্য শৈলশৃঙ্গের শিলাতলে সঙ্গীহীন করে ছেড়ে দেয়। বৃষ্টিবিষন্ন নির্জনপথে দু-একটি যানবাহনের আর্ত হাহাকার, পথের পাশে ডােবার ধারে ব্যাঙের। ডাক যেন এ শ্রাবণ-সন্ধ্যার হৃদয়ের ব্যথিত সংগীত। 
সন্ধ্যার বর্ষণমুখর সৌন্দর্য: এ শ্রাবণ সন্ধ্যায় প্রকৃতির কবি রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা’ নিয়ে বর্ষার কবিতাগুলাে পড়তে ইচ্ছা হলাে। এ সময় গৃহত্যাগী মন আমার মুক্তগতি মেঘপৃষ্ঠে নিয়েছে আসন। আমার ছিন্নবাধা পলাতক এ মন লঘুপক্ষ হংস বলাকার মতাে মেঘের সঙ্গী হয়ে দিগু দিগন্তে ঘুরে বেড়াতে চায়। কোথাও বা বৃষ্টিস্নাত শ্যামলী ধবলী গােহালে প্রত্যাগমনরত, কোথাও বা নিঃসঙ্গ পথিক ওপারে যাবে বলে বর্ষণস্ফীত নদীতীরে মাঝিকে ঘন ঘন ডাকছে। আমি ঠিক বলতে পারি না, ঠিক ঝড়াে সন্ধ্যায় কবি শেলী ‘Ode to the west wind’ কিংবা বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ বর্ষা’ কবিতা লিখেছেন কি
। এ কথা সত্য যে, বর্ষার এ সন্ধ্যায় কবিতা লেখার জন্যে মনে ভাব জাগে। কিন্তু স্যাতসেঁতে মন নিয়ে আমি যখন মেঘের কোলে ঘুরে বেড়াই, সেই। বিশেষ মুহূর্তে কেমন করে কবিতা লেখা যায় বুঝি না। আমার মন এ সময়ে শূন্য হয়ে যায়। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, এ কাজল কালাে মেঘের রূপ দেখে কুঁচবরণ কন্যার মেঘবরণ কেশ মনে পড়তে পারে। বাদলের ঝরঝর ধারা কারও অশ্রুধারার মতাে মনে হতে পারে এবং বিশেষ মনােভাবের বাহ্যিক। প্রকাশ হতে পারে কবিতায়। কিন্তু আমার মনে কবিতা রচনার কোনাে অনুপ্রেরণা দেখি না, কারণ আমি দেখছি সন্ধ্যার আকাশ মেঘে মেঘে ছেয়ে গেছে। নীল আকাশ বিলীন হয়ে গেছে। তারার মালা গেছে ছিড়ে। তার চিহ্ন পর্যন্ত নেই। তবে কবিরা বর্ষার প্রেমিক। বর্ষার বর্ষণধারার মধেo চি তাদের প্রসারিত। অনুভবের দশ-দিগন্ত হতে এ বর্ষণ সন্ধ্যায় কবির দু-একটি কবিতা মুক্তি পেলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। তবে বর্ষণমুখর অন্ধকারে। সুন্দরের যে জোনাক জ্বলে তা অস্বীকার করতে পারি না। বর্ষণমুখর সন্ধ্যার এ সৌন্দর্যমণ্ডিত রূপটি যে কত উপভােগ্য, তা ভুলে যাওয়ার নয়।
শ্রাবণসন্ধ্যায় প্রকৃতি: শ্রাবণসন্ধ্যায় ক্ষণে ক্ষণে বিজলি চমকের সাথে সাথে গুরুগম্ভীর বজ্রনিনাদ সমগ্র প্রকৃতিকে এক অজানা স্বপ্নপুরীতে পৌছে । দেয়। এ সন্ধ্যা গ্রাম-বাংলার প্রকৃতিকে এতই প্রগাঢ় ঘন কালাে ও অন্ধকার করে ফেলে যে, তখন মনে হয় যেন সমগ্র প্রকৃতিকে তা গ্রাস করে। ফেলেছে। অবিরাম বর্ষণধারা এ প্রকৃতিকে আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন, নিশ্চপ, ভাষাহীন ও গভীর করে তােলে। প্রকৃতিতে গভীর ও বিষন্ন রূপ নেমে আসে, যেন গাছের পাতার বহুকালের অশ্রুধারা বর্ষার জল হয়ে ঝরে পড়ছে। 
 
কবিদের দৃষ্টিতে শ্রাবণসন্ধ্যা; কবিদের দৃষ্টিতে শ্রাবণসন্ধ্যা ভিন্ন রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়। বর্ষা কবিদের মনে নতুন শিহরণ জাগায়। তাই তারা বর্ষাকে নিয়ে রচনা করেন বিভিন্ন ধরনের কবিতা। বৃষ্টিসিক্ত বর্ষার রূপক তারা শিল্পসৌন্দর্যে মণ্ডিত করে কবিতায় তুলে ধরেন। বর্ষণমুখর সন্ধ্যার দৃশ্য ও অনুভূতি সাধারণ মানুষ এবং কবির মাঝে আলাদা বৈশিষ্ট্যে ধরা দেয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বর্ষার বাস্তবচিত্র তার কবিতায় তুলে ধরেছেন এভাবে 
নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে। 
তিল ঠাঁই আর নাহিরে। 
 
বর্ষণমুখর একটি দিন রচনা | বর্ষণমুখর বাংলা রচনা
বর্ষণমুখর একটি দিন রচনা | বর্ষণমুখর বাংলা রচনা

উপসংহার: পরীক্ষার আর বেশি দেরি নেই। আলাে জ্বালিয়ে পড়তে বসি। বাইরে পত্র-মর্মরে বাদল-বাতাসের অবিশ্রান্ত হা-হুতাশ, পড়ায় আর মন। বসে না। বৈষ্ণব কবির সুললিত কবিতাটির কথা আমার মনে পড়ে যায় 
রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন। 
রিমিঝিমি শব্দে বরিষে 
পালঙ্কে শয়ান রঙ্গে বিগলিত চির অঙ্গে 
নিন্দ যাই মনের হরিষে।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url