দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার রচনা | দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রচনা

আসসালামু আলাইকুম প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা আমাদের আজকের বিষয় হলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার রচনা বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রচনা। যদি তোমরা এই রচনা টি ভালো ভাবে মনের মধ্যে গুছিয়ে নিতে চাও তাহলে খুব ভালো ভাবে মনোযোগ সহাকারে পড়ে নাও।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার রচনা | দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রচনা
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার রচনা | দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রচনা

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও তার প্রতিকার রচনা

ভূমিকা: বর্তমানে আমাদের জীবনে বহুবিধ সমস্যার মধ্যে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি অন্যতম। নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের প্রতিনিয়ত দাম বাড়তে থাকার কিছু মুনাফাশিকারি ও ভাগ্যবান ধনীকে বাদ দিলে অবশিষ্ট জনসাধারণের জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। সম্প্রতি নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণহীন ঊর্ধ্বগতির ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দুঃখ-দৈন্যে দিশেহারা, হতাশায় ক্লিষ্ট, দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে জপিষ্ঠ। প্রসঙ্গত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ, জনজীবনে তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া এবং এই সংকট থেকে উত্তরণ নিয়ে কিছু ভাবনা-চিন্তার অবকাশ আছে বলে মনে করি। 

পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ: স্বাধীনতার পর বিবিধ সমস্যা মােকাবেলার জন্যে প্রয়ােজন ছিল সুসংহত আর্থিক কাঠামাে প্রণয়ন এবং সে উদ্দেশ্যে। সুপরিকল্পিত আর্থিক নীতির বাস্তব রূপায়ণ। পরিতাপের কথা, আন্তরিকতার সাথে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। দ্বিতীয়ত দিন যত এগিয়েছে, ভ্রান্ত অর্থনীতির চোরাবালিতে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তিল তিল করে ধ্বংস হতে হতে সংকটময় পরিস্থিতির মুখােমুখি এসে। দাঁড়িয়েছে। তৃতীয়ত সরকারি আয়-ব্যয়ের অসমতা পৌনঃপুনিক ও ক্রমবর্ধমান ঘাটতির কারণ হয়েছে। ফলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণের বােঝা। বইতে হচ্ছে, নতুন নােট ছেপে ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে, কিংবা জনসাধারণের ওপর চাপাতে হচ্ছে প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ করের বােঝা। নতুন নােট ছাপার । বিপদও আছে। নতুন নােটের যােগানের সাথে পণ্য উৎপাদন না হলেই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। পরিণামে টাকার ক্রয়-ক্ষমতা কমে, পণ্যসামগ্রীর দাম বেড়ে যায় লাফিয়ে লাফিয়ে আর করের বােঝা সামলাতে জনগণের পকেটে পড়ে অস্বাভাবিক টান। চতুর্থত পণ্যদ্রব্যের যােগানের চেয়ে চাহিদা বেড়ে গেলে। মল্যবৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়ে। পঞমত সরকারি নিয়ন্ত্রণের ফাঁকফোকরে অথবা প্রশাসনিক ঔদাসীন্যের সুযােগে মুনাফাশিকারি অসাধু ব্যবসায়ীর দল। বাজারে পণ্যসামগ্রীর কত্রিম অভাব সৃষ্টি করে মূল্যস্তরকে দেয় বাড়িয়ে। ষষ্ঠত অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে পণ্যের যােগান অক্ষণ থাকলে চাহিদা-যােগানের ভারসাম্য যায় নষ্ট হয়ে। ফলে মূল্যস্তরে পড়ে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব। সপ্তমত কালাে টাকার আধিপত্য পণ্যমূল্যকে উর্দমজী কৰে। কালাে টাকার কৃপায় একশ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এত বৃদ্ধি পায় যে, তারা যথেষ্ট মল্য দিয়ে ভােগ্যপণ্য ক্রয় করে। বিপরীত। দিকে গরিব মানুষের দুঃখ-দৈন্য আরও বাড়ে। অষ্টমত প্রতিবছর বাজেটে কর প্রস্তাবের সুযােগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা কর আরােপিত পণ্যদ্রব্য বাজার । থেকে রাতারাতি সরিয়ে ফেলে কৃত্রিম অভাব তৈরি করে ও অগ্নিমূল্যে সেই পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে মােটা টাকার মুনাফা লােটে।

দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া: পণ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষেতে-খামারে, কলকারখানায় খেটে খাওয়া শ্রমজীবী । নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। তারা দিন দিন গরিব থেকে আরও গরিব হচ্ছে। অপরপক্ষে বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কালাে টাকার পাহাড় জমছে। এই আর্থিক বৈষম্য সমাজজীবনে আনছে অশান্তি। এই আর্থিক বৈষম্য সমাজজীবনে আনছে অশান্তি। দারিদ্র্য ও অভাব অনটনের তাড়নায় পিষ্ঠ শ্রমিক ও চাকরিজীবী মানুষ বেতন ও ভাতার দাবিতে সােচ্চার হচ্ছে। ফলে মিছিল ধর্মঘট বর্তমানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আন্দোলন, বিক্ষোভ, জনরােষ অসন্তোষের প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু এটাই প্রতিকার নয়, এতে প্রতিকারও হয় না। তবু দুঃখ দুর্গতির শেষ সীমায় গিয়ে মানুষ যখন দাঁড়ায় নিত্য জীবনের একেবারে প্রাথমিক চাহিদাটুকু মিটাতেও ব্যর্থ হয়, তখন বিক্ষোভে ফেটে পড়াটাই হয় তার সান্ত্বনা । 

জনজীবনে প্রভাব: সমাজে এত যে অসন্তোষ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ দিনে দিনে পুঞ্জীভূত হচ্ছে এর মূলেও অনেকাংশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি দায়ী। অভাব-অনটন আর সীমাহীন দারিদ্র্যের সাথে নিরন্তন লড়াই করতে করতে মানুষ শুভ বােধ বুদ্ধি হারিয়ে, ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ও জীবনসংগ্রামে পর্যদস্ত মানুষ অসামাজিক কাজকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। সমাজে অশান্তি ও উদ্ধৃঙ্খলতা বাড়ছে। কলকারখানায় বেতন বৃদ্ধির দাবিদাওয়া নিয়ে মিটিং-মিছিল, ধর্মঘট লেগেই আছে। ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষেত মজুরেরাও মূল্যবৃদ্ধির সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে না পেরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘটের পথ বেছে নিচ্ছে। দাবি অনেক সময় হয়ত মঞ্জুর হচ্ছে। কিন্তু আয়-ব্যয়ের পাল্লায় সমতা না এলে এ সমস্যার প্রতিকার করা সহজ হবে না।

কিছু প্রতিক্রিয়া: দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অস্বাভাবিক প্রবণতা বর্তমানে কেবল বাংলাদেশের মতাে উন্নত দেশেও এ প্রবণতা লক্ষণীয়। তবে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ওপর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভা প্রবণতা বর্তমানে কেবল বাংলাদেশের মতাে উন্নয়নশীল দেশে নয়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানের মতাে তবে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ওপর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবের ব্যবধান দুস্তর। উন্নয়নশীল দেশে গরিবেরাই। সংখ্যাধিক, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি তাদের দারিদ্র্যকে আরও দুঃসহ করে। উন্নত দেশে দারিদ্র্যের চিত্র এমন প্রকটভাবে ধরা পড়ে না। কারণ, সেখানে দামের উধ্বগামিতার সাথে আয়ের সামঞ্জস্য আছে। বাংলাদেশে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লা ভারী। 

প্রতিকারের বিবিধ পন্থা: এই দুঃসহ অবস্থার প্রি বাবষ পন্থা: এই দুঃসহ অবস্থার প্রতিকারে সর্বাগ্রে সরকারের সক্রিয় প্রয়াস-প্রচেষ্টার যেমনই প্রয়ােজন, তেমনই দরকার পণ্যসামগ্রীর চাহিদা ও যােগানের মধ্যে সমতা রক্ষা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল রেখে ভােগ্যপণ্যের উৎপাদন অক্ষণ রাখতেই হবে। ভােগ্য পণ্যের উৎপাদন হাস। পেলে মূল্যস্তরকে বেঁধে রাখা হবে অসম্ভব। মুনাফাশিকারি ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারী আইনের ফাঁকফোকরে কিংবা সরকারি ঔদাসীন্যের দুর্বলতায়, বাজেটে কর প্রস্তাবের সুযােগে অথবা যােগানের অপ্রতুলতাহেতু কৃত্রিম অভাব তৈরি করে যাতে মুনাফা লুটতে না পারে তা দেখতে হবে। কালাে টাকা উদ্ধার করতে হবে, পণ্য উৎপাদনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন নােট ছাপাতে হবে সতর্কতা অবলম্বন করে যাতে, মুদ্রাস্ফীতি পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ ন হয়ে দাঁড়ায়। ঘাটতি বাজেটের ক্ষতিকর দিকটি আমাদের সকলের জন্যে প্রযােজ্য। সরকার এ ব্যাপারে সাবধান হবে— এটাই প্রত্যাশিত। 

উপসংহার: উল্লিখিত সম্ভাব্য পন্থা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রােধে অবশ্যই সক্ষম এমন কথা কেউই হলােফ করে বলতে পারেন না। সেজন্যেই বােধ করি। বিশেষজ্ঞদের চিন্তাভাবনার অন্ত নেই। এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে মাঝে মাঝে প্রবােধ ও সান্ত্বনাসূচক কথাবার্তা শােনা যায়। কিন্তু প্রতিকারের বাস্তব রূপায়ণ থাকে অনেক দূরে। পকেটে যদি টাকা না থাকে, দেহ খাঁচায় প্রাণ পাখিটি যতক্ষণ বেঁচে আছে, ততক্ষণ তাে খালি হাতে হাটে-বাজারে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, তাতে ক্ষুধার অন্ন, পােশাক, রােগের ওষুধ, গৃহের প্রয়ােজনীয় দ্রব্যসামগ্রী মিলল কিনা কে তার খোঁজ রাখে, এ মর্মবেদনার শরিকও কেউ হয় না।

Next Post
No Comment
Add Comment
comment url